বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারী ২০২১ || মাঘ ৮ ১৪২৭ || ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Logo

দেশ ভাগ হলেও ভাগ হয়নি সম্প্রীতি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

আপডেট: বুধবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২১

৭৮

দেশ ভাগ হলেও ভাগ হয়নি সম্প্রীতি

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশজানি সীমান্তে বাংলাদেশ আর ভারতের মানুষের একটি মসজিদ। সীমান্তের এই জামে মসজিদটি দুই দেশের মানুষকে একটি সমাজে আবদ্ধ রেখেছে। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগ হলেও ভাগ হয়নি তাদের সমাজ-সম্প্রীতি।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের আন্তর্জাতিক মেইন পিলার নং ৯৭৮ এর সাব পিলার ৯ এস’র পাশে এই দুই বাংলার মসজিদটি অবস্থিত। উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ থানার ঝাকুয়াটারী গ্রাম এবং দক্ষিণে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাঁশজানি গ্রাম।

মসজিদটি সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে নির্মিত। মসজিদটির নাম ঝাকুয়াটারী সীমান্ত জামে মসজিদ। মসজিদটির বয়স প্রায় দুইশ’ বছর হবে বলে দুই দেশের স্থানীয়রা জানায়।

বৃটিশ শাসনামল থেকে মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে সম্প্রিতির প্রতীক হয়ে। দেশভাগের আগে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে এই সমাজটি গড়ে ওঠে। পরবর্তিতে ১৯৪৭ দেশ ভাগ হলে গ্রামটির উত্তর অংশ চলে যায় ভারতের অংশে এবং দক্ষিণ অংশ বাংলাদেশের অংশে। ভারতীয় অংশের নাম হয় ঝাকুয়াটারী এবং বাংলাদেশের অংশ নাম হয় বাঁশজানি গ্রাম। ভারতের অংশটি কাটাতারের বেড়ার বাহিরে পড়ে যায়।

গ্রামটি আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার দিয়ে ভাগ হলেও ভাগ হয়নি তাদের সমাজ। প্রতিবেশির মতই তাদের বসবাস। তবে আচরণিক, স্বাংস্কৃতিক, ভাষাগত কিছুটা পার্থক্য রয়েছে এখানকার মানুষদের।

ভারতীয় অংশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গের টানে বাংলা ভাষায় কথা বলে এবং ওই সংস্কৃতিতে রপ্ত। আর বাংলাদেশের অংশে রংপুরের আঞ্চলিকতার টানে কথা বলে থাকে তারা। ভিন্ন সংকৃতি ভিন্ন দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা একই সমাজের বাসিন্দা, একই মসজিদের মুসল্লি।

মসজিদের মুয়াজ্জিন বাঁশজানি গ্রামের বাসিন্দা নজরুল মিয়া (৬১) বলেন, আযানের ধ্বনিতে দুই বাংলার মুসিল্লরা ছুটে আসেন মসজিদে। একসঙ্গে আদায় করেন নামাজ। একাকার হয়ে যায় একে অপরের প্রীতি ভালোবাসা।

তিনি বলেন, মসজিদ থেকে বের হয়ে কোলাকুলি করেন দুই বাংলার মানুষ। নিজেদের মধ্যে বিনিময় করেন কুশলাদি। বিতরণ করেন শিরনি। তারা সীমান্তে একে অপরের মাঝে দুঃখ-বেদনা ও সুখের কথা আদান প্রদান করে থাকেন। একই সমাজভুক্ত হওয়ায় একে অপরের বিপদে-আপদে ছুটে আসেন বলেও তিনি জানান।

একই গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঐতিহ্যবাহী এই সীমান্ত মসজিদটি দেখতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরাও আসেন। তারা এই মসজিদে নামাজ পড়ে কালের স্বাক্ষী হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভারতের ঝাকুয়াটারী গ্রাম থেকে আসা মুসল্লি খয়বর আলী (৭৮) বলেন, সীমান্ত মসজিদটি দুইশ’ বছরের পুরনো হলেও অবকাঠামোগত কোন উন্নতি হয়নি। সীমান্তে অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা থাকায় এটি সম্ভবও হচ্ছে না। দুই বাংলার মানুষেরাই যৌথভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়ে অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামত করেন।

মসজিদের ইমাম বাঁশজানি গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক (৪৩) বলেন, শুক্রবার জুম্মার নামাযের দিন সীমান্তে এই মসজিদটি আরো বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ও ভারতের মুসল্লিরা পাতিল-বালতি ভরে নিয়ে আসেন তবারক। নামাজ শেষে বিতরণ করা হয় তবারকগুলো।

ভারতের গাড়ল ঝড়া জুনিয়র হাই স্কুলের ৫ম শ্রেণির ছাত্র মাসুদ শেখ জানায়, অবসরে দুই দেশের শিশুরা মিলেমিশে খেলাধুলা করে থাকে। কোনদিন তাদের বিবাদ হয়নি। এক ওপরের আনন্দ বেদনা ভাগাভাগি করে নেয় তারা।

ভারতের ঝাকুয়াটারী গ্রামের আহমেদ আলী (৬৫) বলেন, গ্রামের মাঝ বরাবর একটি কাঁচা সড়ক আছে। এই সড়কটির অর্ধেক হলো বাংলাদেশের আর অর্ধেকটা ভারতের। উভয় দেশে নাগরিক যৌথভাবে এই সড়কটি ব্যবহার করে থাকেন। মেরামতের সময় তারা যৌথভাবে নিজেরাই কাজ করেন।

তিনি আরো জানান, ভারতের ঝাকুয়াটারী গ্রামে ৪৫ পরিবারের আড়াইশ মানুষের বাস। এই গ্রামে জমিজমা ও বসতভিটা থাকায় তারা কাঁটাতারের বেড়ার ভেতর চলে যাননি। এই গ্রামে থেকে গেছেন। তাছাড়া সীমান্তের এপারের মানুষের সাথে তাদের রয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন। তাদের মধ্যে কোনদিনই ঘটেনি কোন ঝগড়া বিবাদ ও জটিলতা।

মসজিদটির সম্পাদক বাংলাদেশের অংশের বাসিন্দা কফিলুর রহমান জানান, পূর্বপুরুষ থেকে এই একটি সমাজে আমাদের বসবাস। দেশভাগ হলেও আমাদের সমাজ এবং মসজিদ ভাগ হয়নি। দুই দেশের আইনি জটিলতা আমাদের উপর প্রভাব পড়েনি।

মসজিদটি দর্শন এবং নামাজ পড়তে আসা কয়েকজন মুসল্লি জানান, এই মসজিদটিতে দুই দেশের মানুষের সাথে নামাজ পড়ে অত্যন্ত ভালো লেগেছে। তাদের সহবাস্থান দেখে অনেক কিছু শেখার আছে। তবে মসজিদটির জীর্ণ অবস্থা তাদের মর্মাহত করেছে। এমন ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি মেরামত ও রক্ষা করার দাবি জানান তারা।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর মিঠু বলেন, এই সীমান্তের উভয় বাংলায় বসবাসকারীরা একে অপরের আত্মীয়। দেশভাগের সময় তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাগ হলেও আত্মীয়তার বন্ধন ভাগ হয়নি। শুধু মসজিদে একসাথে নামাজ পড়া নয়, উভয় বাংলার পারিবারির অনুষ্ঠানেও তারা একে অপরকে দাওয়াত করেন।

তিনি আরো জানান, কেউ মারা গেলে উভয় পাড়ের মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করে। তাদের সমাজও একটি। উভয় দেশের সীমান্তক্ষী বাহিনীও তাদের শান্তিপূর্ণ বসবাসে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

ফেসবুকে ফলো করুন